(Currently only one issue is available)
About eMusic  |  ই-মিউজিক প্রসঙ্গে

FOREWORD

eMusic is a bi-lingual eMagazine run by MUSIC edited by Tanika Bhattacharya. It was originally launched in mid 2016, and it should be kept in mind that some of the text contents in some articles in the first issue have relevance to those days, not to current times. In mid 2018, the entire website of MUSIC was remodelled with new technology, new system, and entirely new design. Some minor grammatical/ spelling errors in the erstwhile version have also been corrected. The eMusic section has come under the purview of this change too. In the erstwhile version, Bangla text in eMusic was used in frozen (imaged) form. In the new version it's live text now. The quality of the photographs used is also much better.

প্রাক-কথন

ই-মিউজিক তনিকা ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত মিউজিক সংস্থার একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। এটি ইংরেজি ২০১৬ সালের মাঝামাঝি প্রবর্তিত হয়, কাজেই মনে রাখতে হবে, প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত লেখাগুলির কোনো কোনো অংশ তৎকালীন সময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক, আজকের জন্য নয়। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি মিউজিক সংস্থার সম্পূর্ণ ওয়েবসাইট'টির প্রযুক্তি, সিস্টেম এবং ডিজাইনের আমূল পরিবর্তন করা হয়, পুরোনো কন্টেন্টেরও সামান্য কিছু ব্যাকরণ-গত / বানান-গত ভুল শুধরে দেওয়া হয়। এই পরিবর্তনের আওতায় এসে ই-মিউজিক'ও নবরূপে প্রকাশিত হয়। পুরোনো সংস্করণে বাংলা হরফ'গুলি ইমেজ আকারে ছিলো, এখন টেক্সট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। আনুসঙ্গিক আলোকচিত্র (ফটোগ্রাফ)'গুলিও আরও উন্নত রিজোলিউশন সম্বলিত।
DISCLAIMER
Some artworks and photographs used in eMusic are taken from the internet, which are essentially from web domains that are free for public viewing and allow visitors to copy and use pictures from them without any notified restriction. The map used in the photo-feature has been taken from GoogleEarth.
There is a basic difference between the text used in the basic designing of eMusic and the text used in the published articles. The later is typed by the contributors, mostly on word files which are copy pasted here, since re-typing them for the web can be an enormous task and typing errors might also occur. However, there are some symbols (like quotation marks, the '&' sign, long dash, etc) whose coding on word file differs from the coding of web language. Although most of the advanced browsers still reproduce them correctly even if the correction is not done, some browsers may not be able to read one or more such symbol(s). Efforts have been put to correct them as far as possible, but in case someone finds some strange character somewhere (misrepresented by the browser), please let us know, we will correct them.
First issue
সম্পাদকীয়
তনিকা ভট্টাচার্য

যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে সে যুগের গানেরও পরিবর্তন ঘটে, যার সাক্ষ্য রয়ে যায় সে যুগের সমকালে। পৃথিবীর গানচর্চার ইতিহাসে তাই সমকালীন গানের নব নব আঙ্গিক ও গায়নরীতি বিষয়ক চর্চা নিঃসন্দেহে মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভারতীয় গানের প্রেক্ষিতে সমকালীন গান বা contemporary music একেবারেই বহুল চর্চিত বিষয় নয়। 'দেশকালের পরিবর্তনে ও জনরুচির টানে' বর্তমান সময়ের গান অতীতের হাত ধরে কতটা অগ্রসর হল বা বদলে গেল আর সেই বদলটা গানবাজনাকে কতটা সমৃদ্ধ করল বা আদৌ করল কিনা সে বিষয়ে সিরিয়স চিন্তার দৈন্য স্পষ্ট।

এখন প্রশ্ন হল 'সমকাল', এই বিষয়টি, গানে কীভাবে দেখা যেতে পারে? সমকালের গান এখনকার গান, যে গান এখনকার সময়ের কথা বলে। এখনকার সময়ের গান কি ঐতিহ্যকে ভেঙেচুরে সম্পূর্ণ নতুনের অভিলাষী নাকি প্রথাকে সঙ্গে নিয়েই সৃষ্টির উপভোগ করতে চায় সে? সমকাল কি বৈদিক ভারতের মার্গ বা প্রথাবদ্ধ সংগীতকে স্থান দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে বর্তমানেই। ধ্রুপদী গান ও নানা বর্গের দেশী গান, যার ধারাবাহিক চর্চা আজও অব্যাহত, সেগুলিও স্থান পাবে সমকালে। ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি, গজল বা ভজন এখনকার কন্ঠশিল্পীদের গায়নে কী মাত্রা পেয়েছে সেটিও আলোচ্য এই সময়ের গানে। দেশ ও কালের স্রোত বেয়ে এই গান বয়ে চলেছে আজও গায়নের নানান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। এই ঐতিহ্যের মধ্যে হঠাৎই কোনও জিনিয়স কম্পোজারের আবির্ভাব স্থায়ী জায়গা করে নেয় এই সমকালেই – সারা পৃথিবীর বাঙালীর কাছে যেমন রবীন্দ্রনাথের গান বা দক্ষিণ ভারতীয়দের কাছে যেমন ত্যাগরাজের কৃতি। প্রথাগত সংগীতচর্চার সাথে সমান্তরালভাবে যুক্ত হয়ে প্রথাকে ভেঙেচুরে নানান পরীক্ষানিরীক্ষারই ফলশ্রুতি সৃজনশীল নতুন গান। নতুন গানের আঁতুড়ঘর হল সমকালীন গান, যা সারা পৃথিবী জুড়েই সৃষ্টি হয়ে চলেছে। যে গানে ফুটে উঠছে মানুষের সুখদুঃখ, আশা-নিরাশা, লড়াই, সাফল্য-ব্যর্থতা, ভালবাসা, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন, ভয়-লজ্জা ও একঘেয়েমি, ফুটে উঠছে সেইসব অনুভূতি যা আমাদের যাপনের অভিজ্ঞতায় নিহিত। লিরিক নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার সাথে মিশেল ঘটেছে সুর নিয়েও নানান ভাবনার যা কখনও দেশজ, কখনও বা পাশ্চাত্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত। রেকর্ডিং শিল্পের প্রভূত প্রসারণের ফলে সমকালীন গানকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে সংগীতায়োজন নামক একটি বিষয় উঠে এল, যা গানগুলিকে আরও মনোগ্রাহী করে তুলতে অনেকাংশেই সক্ষম হল। গানের টেম্পারামেন্ট অনুযায়ী দেশীবিদেশী যন্ত্রের প্রয়োগে তৈরি হতে লাগল এক চিত্তাকর্ষক সাউন্ডস্কেপ।

এই বিশিষ্ট সংগীতচর্চার সাথে সাথে ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতি আর এক ধারার গানের দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে, যাকে বলা যেতে পারে সিনেমার গান। চলচ্চিত্রের গানে অভূতপূর্ব সব সৃষ্টি সত্ত্বেও সিনেমা শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী ‘বাজারি গান’-এর ধাক্কায় ক্রমশঃ কোণঠাসা হয়েছে সৃজনশীল সংগীত। বাজার অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণের ফলে নতুন সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার না দিয়ে পুরনো জনপ্রিয় গানকেই ‘স্বর্ণযুগের গান’-এর মোড়কে বারবার ফিরে দেখতে চাওয়ার প্রবণতা বেড়েই গিয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় বা স্বল্পশ্রুত গানকে নতুন আঙ্গিকে ফিরিয়ে আনলে সমকাল হয়ত আংশিকভাবে উপকৃত হয় কিন্তু নস্টালজিয়াকে উস্কে বারবার বহুশ্রুত গানগুলিতে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা সৃজনশিল্পের গতিকে ব্যহত করে।
'মুভমেন্ট ফর আন্ডারস্ট্যান্ডিং সংগীত – অ্যান ইন্ডিয়ান কনসেপ্ট’ অর্থাৎ ‘মিউজিক’ দশ বছরে পা দিল। সেই উপলক্ষে কিছু বাংলা আর কিছু ইংরেজি রচনা নিয়ে প্রথম e-magazine, ‘e-MUSIC’-এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হল। এই পত্রিকার মূল উদ্দেশ্য এখনকার গানবাজনার চর্চা নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা। সংগীত সংক্রান্ত পত্রিকা যেহেতু, তাই পরবর্তী সংখ্যা থেকে e-MUSIC–কে audio-visual পত্রিকা হিসেবে উপস্থাপন করবার ইচ্ছে রইল। যাঁদের অবদানে পত্রিকাটি সমৃদ্ধ হল, ‘মিউজিক’-এর পক্ষ থেকে তাঁদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।

সূত্রঃ বাংলা গানের অদীন ভুবন, সম্পাদক – সুধীর চক্রবর্তী – কারিগর

হৈমন্তী শুক্লা। নামটাই যথেষ্ট। তবে এটুকু বাড়তি পরিচয় দেওয়া এখানে প্রাসঙ্গিক, যে উনি 'মিউজিক'-এর একজন সদস্যা। আমাদের পত্রিকার জন্য এই প্রথমবার গান-বাজনার জগতের এমন সব মহারথীদের কথা শোনাচ্ছেন যাঁদের সংগীত পরিচালনায় তিনি কাজ করেছেন। পরেরবার থেকে হয়ত একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তিত্বের কথাও শোনাতে পারেন। প্রথমবার শুধু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ১৬ জুন তাঁর জন্মদিন। এই মাসেই প্রকাশিত সংখ্যায় এটাই তাঁকে 'মিউজিক'-এর শ্রদ্ধার্ঘ।
হেমন্তদা
হৈমন্তী শুক্লা
আমি হেমন্তদা'কে প্রথম দেখি যখন 'আমার প্রভাত মধুর হল' গাইতে যাই। মানবদা'র (মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়)সঙ্গে তখন নিয়মিত তবলা বাজাতেন নৃপেনদা। নৃপেনদা আমাদের বাড়িতেও আসতেন। আমাকে অনেক জায়গায় গান গাইতে নিয়ে যেতে চাইতেন। বাবা আপত্তি করতেন, বলতেন "এইসবের এখনও অনেক সময় আছে"। ওই নৃপেনদাই খবর আনলেন যে রবীন চট্টোপাধ্যায় একজন বাচ্চা মেয়ে খুঁজছেন, যার তৈরি গলা হবে। আমি গেলাম, সুরশ্রী অর্কেস্ট্রাতে। রাধুদা (রাধাকান্ত নন্দী) ছিলেন। আমার গান শুনে ওঁদের পছন্দ হল। হেমন্তদার তখন কোমরে চোট। আধশোয়া হয়ে গান করতেন। রেকর্ডিঙের সময় চেয়ারে বসতেন। হেমন্তদা আর প্রতিমাদি (বন্দ্যোপাধ্যায়) গাইছেন, একটাই মাইকে। ওই একই মাইকে আমি যাতে চার লাইন গাইতে পারি সেইজন্য আমাকে একটা টুলের ওপর দাঁড় করানো। যখন আমার গাওয়ার জায়গাটা আসছে, হেমন্তদা ঘাড় ধরে আমাকে মাইকের কাছে এগিয়ে দিচ্ছেন। মনে হইয়েছিল কী বিরাট মানুষের সামনে এসে দাঁড়ালাম!

তার আগে বাড়িতে বাবা, ভাই-বোনেদের সঙ্গে ঝগড়া হত হেমন্ত-মান্না নিয়ে। বাবা বলতেন "মান্না দে কত তৈরি... হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ঠিক আছে... ওই সবসময় একটু নরম নরম গান করেন।" কিন্তু আমার খুবই ভাল লাগত। শৈলেন মুখোপাধ্যায়ের সুরে আমার প্রথম গান প্রকাশের সময় থেকেই শৈলেনদার খুব ইচ্ছে ছিল যদি আমি কখনও হেমন্তদাকে সামনে থেকে গান শোনাতে পারি। সেই সুযোগ হল একটা অনুষ্ঠানে। তখন আমি মঞ্চে হেমন্তদা'র অনেক গান গাইতাম। যদিও রজনী, ওরে মনপাখি, এইসব আমার নিয়মিত গাওয়া হতই। একটা অনুষ্ঠানে হেমন্তদা শুনলেন। স্টেজ থেকে নামার সময় দেখি সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতটা বাড়িয়ে বললেন "আয়..."। মনে হল কতদিনের চেনা। পরে বুঝেছিলাম যে টোপাদা (অমর দত্ত) ওনাকে আমার কথা, আমার বাবার কথা বলেছিলেন আগেই। আমাকে বললেন – "তোর খুব মিষ্টি গলা। ভাল গাইছিলি। তুই কি প্রোগ্রামে এই গানগুলোই গাস? একদিন বাড়িতে আসিস।" বলে নিজেই আমার গানের খাতায় নাম-ঠিকানা লিখে দিলেন।

যেদিন বাড়ি গেলাম সেদিন বললেন - "হ্যাঁ রে... আমার হিন্দি গানগুলো তো তুই ভালই গাইতে পারিস। আমি মণিপুর যাচ্ছি। আমার সঙ্গে যাবি? ডুয়েট গাইবি...", বলেই গানের খাতা এগিয়ে দিলেন। সেই খাতায় 'জাগ দর্দ-এ-ইশ্ক', 'ছুপা লো ইয়ুঁ দিল মে' এইসব গান লেখা। আমার মনে হল একজন অভিভাবক পেয়েছি।

​মণিপুর যাবার পথে সারা রাস্তা আমাকে অনেক কিছু বোঝালেন - ​"​তুই প্রথমে দু​'​-তিনটে গান করবি, তারপর আমি বসব। আমার ক’টা গান গাওয়া হয়ে গেলে তোকে ডেকে নেব। আমরা তারপর ডুয়েটগুলো গাইব।​" আমি গাইতে বসে একটা গান গেয়েছি সবে, মনে হল সবাই হেমন্তকে চায়, আমার গান যেন কেউ শুনছে না। আমি পরের গানটা আধখানা গেয়ে শেষ করে, নমস্কার করে নেমে এসেছি। হেমন্তদা আমার হাতটা ধরে বললেন - ​"​তোর বুদ্ধি আছে, তুই নাম করে যাবি।​"

এরপর থেকে আমার কাছে ক্রমশই যেন বাবার মতো হয়ে উঠলেন। কখনও বাইরে গেলে চিঠিতে লিখতেন "শরীরের দিকে খেয়াল রাখবি। গলাটা যেন ঠিক থাকে।" কখনও বলতেন - "তুই এত রোগা কেন? দুধ-কলা দিয়ে ভাত খাবি, চেহারাটা তাজা হবে।" এরকম লোককে বাবা ছাড়া কী বলব?

ছোট ছোট কত ঘটনা মনে পড়ে... একবার দাদা কোনও একটা গানে humming করছেন, দেখাদেখি আমিও একটু করতেই বললেন – "মেয়েদের গলায় ওগুলো ভাল লাগে না। আমার ভারি গলায় মানিয়ে যাচ্ছে, তুই করিস না।"

গানের নামে কোনও অস্বাভাবিকতা পছন্দ করতেন না। আমি কম বয়সে গলায় মাফলার জড়াতাম বলে বলেছিলেন – "ওটা কী! খোল্!" আমি বলতে গেলাম "দাদা ঠাণ্ডা লাগবে।" মোটেই শুনলেন না।

একটা সিনেমাতে আমি একবার "তুমি নির্মল করো" গানটা গাইব বলে কথা হল। দাদা সংগীত পরিচালক। আমি জানতে চাইলাম কারা বাজাবেন। বললেন – "কিচ্ছু না, ওই মান্তান তবলাটা ধরবে, বালসারা থাকবে, একটু পিয়ানো বাজিয়ে দেবে'খন।" প্রায় কোনও বাজনা ছাড়া গাইতে রেকর্ডিঙের দিন আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম বলে দেখি পকেটে করে কোরামিনের শিশি নিয়ে গেছেন হেমন্তদা।

এরকম পিতৃস্নেহের সঙ্গে দরকার হলে শাসনও ছিল। দুর্গাপুরে একটা অনুষ্ঠানে আমি একবার সংগঠকদের সঙ্গে একটু মাথা গরম করে ফেললাম। দাদাও ছিলেন। একবার শুধু বড়ো করে চোখ পাকিয়ে আমার দিকে তাকালেন - "আআহ্... ওরকম বলতে নেই।" আমি মুগ্ধ হয়ে দেখলাম আমার মতো নতুন একজন যেখানে রেগে যাচ্ছে সেখানে মহাতারকা হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কেমন ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন। অনুষ্ঠান সংগঠক আর শ্রোতাদের প্রতি অপরিসীম সম্মান ছিল হেমন্তদা'র। শ্রোতাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে বলে ব্যালেন্স করা, এমন কী যন্ত্র মেলানোতেও বেশী সময় দিতে চাইতেন না। আমি তার কণামাত্র শিখতে পেরেছি হয়ত। আমি দেখেছি দাদার গলা দিয়ে আওয়াজই বেরোচ্ছে না, তাও অনুষ্ঠানে গেছেন। বলেছেন - "টাকা পয়সা নিয়েছি, অতগুলো লোক আমার জন্য বসে আছে, আমার ওখানে উপস্থিত হওয়াটাই জরুরি।" এই বলে গিয়ে আবার গেয়েছেনও বটে, প্রথম দুটো গান খুব খারাপ গেয়ে, তৃতীয় গান থেকে সেই চেনা হেমন্ত মুখুজ্যে।

অনেক বড়ো মনের মানুষ ছিলেন। কাউকে তাঁর প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করতেন না। ছোটদের সুযোগ দিতে গিয়ে সংগঠকদের অনেকসময় নিয়ন্ত্রণ করতেও দ্বিধা করেননি। ওনার সঙ্গে একটা অনুষ্ঠানে কে গাইবে উনিই ঠিক করে দিয়েছেন। সেই ইচ্ছে ছিল, সেই ব্যক্তিত্বও ছিল।

একবার একজন সংগীত পরিচালকের সঙ্গে হেমন্তদা'র কথা হয়েছে যে উনি পুজোয় তাঁর সুরেই গান করবেন। তারপর অন্য কেউ এসেছেন ওই একই অনুরোধ নিয়ে। দাদাও তালেগোলে, পাঁচরকম ব্যস্ততায় ভুলে গেছেন। দ্বিতীয়জনের সুরেই রেকর্ডিং করে ফেলেছেন। প্রথমজনকে বললেন - "খুব ভুল হয়ে গেল, পরেরবারে আর এরকম হবে না"। পরের পুজোতে যা হল, তার তুলনা নেই। একটা গান তো সেই সংগীত পরিচালকের কাছ থেকে নেওয়া ছিলই, আরেকটা গানে হেমন্তদা নিজে সুর দিয়ে সেই সংগীত পরিচালকের নাম দিয়ে রেকর্ড বের করে দিলেন।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জীবনেও খারাপ সময় এসেছে। বম্বেতে কাজ কমে গেছে, কলকাতায় ফিরে এসেছেন, কিন্তু এদিকে আবার ততদিনে উত্তমকুমারের প্লেব্যাক গাইতে শুরু করেছেন মান্না দে। তখন দেখেছি শুধু শ্রোতাদের সঙ্গে জনসংযোগ রাখতে একইদিনে একাধিক প্রোগ্রাম করে গেছেন। দু'টো শেষ করে তৃতীয় অনুষ্ঠানে এসেছেন, আমাকে বলছেন - "খুব খিদে পেয়েছে, কিছু খাবার পাওয়া যাবে?" পাশ থেকে কেউ শুনতে পেয়ে পাড়ার দোকান থেকে গরম সিঙাড়া এনে দিল। দুটো সিঙাড়া গপ্ গপ্ করে খেয়ে, চা খেয়ে হেমন্তদা গান করতে উঠছেন, এমন দৃশ্যও দেখেছি। সেই সময় ফুলেশ্বরী হিট করল। একবাক্যে দাদা বলতেন - "তনুবাবু (তরুণ মজুমদার) তো আমাকে রাস্তা থেকে টেনে তুলল"।

হেমন্তদা না থাকা মানে বাংলা গানের সরলতা না থাকা। তার মানে এই নয় যে দাদা শুধু সহজ গান গাইতেন। তোমরা যারা গান করো, কোনোদিন "আমার গানের স্বরলিপি" হারমোনিয়ম বাজিয়ে গেয়ে দেখো। কোথা থেকে কোথায় গানের পর্দা গেছে, আর কত সোজা-সাপ্টা করে উনি গেয়ে দিয়েছেন। সোজা রাস্তায় মাথা উঁচু রেখে বাংলা গানের এই চলাটাই হেমন্তদা নিয়ে চলে গেছেন।
Semi-classical Semi-extinct
Snigdhadeb Sengupta

This is a strange coincidence. Ever since we have thought about MUSIC publishing an e-magazine, and myself writing an impression about the present scenario in semi-classical music around me in it, some relevant news has been reaching me. Let us begin with some of these bits and pieces of information.

Sri Vinod Kapoor, a prominent businessman and an avid music lover from Delhi, runs an organisation called Baithak. This organisation regularly holds classical music concerts. They have also held an event where upcoming semi-classical singers from different parts of the country are selected to perform in front of a distinguished audience. The audience comprises revered musicians and keen listeners. The concerts are held in several cities and a selected singer is not necessarily asked to perform in his or her hometown. The aim is to make a singer familiar to an audience living in a different part of the country.

When I got to know about this, it occurred to me that there aren't, unfortunately, enough media through which we get to know what's happening in music, in the other parts of our country. We don't know about a Marathi singer unless he or she hasn't sung in a Hindi film. We keep complaining that there is virtually no market left for non-film original music in Bangla. But we don't bother to care about non-film Tamil or Kashmiri songs.

In this circumstance, how many listeners is semi-classical music expected to attract? Few, I suppose. I also suppose that the present listeners of Indian Music only have a sketchy idea of what 'semi-classical' music exactly means. The fine line between classical and semi-classical music is not very clearly visible to many, including myself. I have been a student of Hindusthani style of music since when I was 9 years old. My Gurus have pointed out the differences between salient features of a khayal, a thumri, a dadra, a kajri and a chaiti to me. But I have somehow always failed to comprehend why a dhrupad and a khayal are 'classical' and a thumri and a bhajan are 'semi-classical'. Classical art forms are characteristically old and somewhat conservative when presented in their purest forms. And, surely, dhrupad came first, followed by khayal and thumri and the rest emerged later. But surely, a khayal bandish composed yesterday will never be treated as semi-classical. Whereas, a thumri sung pretty regularly for the last 250 years is still semi-classical. So, the thumb rule of the old and the traditional being grouped as classical goes out of the window, or at least sits on the window pane, ready to fly away any moment.

We don't have concerts showcasing only semi-classical music often in Kolkata, or any part of Eastern India for that matter. When we go to the market to buy some audio albums of semi-classical music, the bulk that we get are renditions by the greats of the past. Thumri, dadra, bhajan and the likes are nowadays usually presented as short, 10-15 minutes items at the end of an elaborate khayal performance. Much like a mouth-freshener served at the end of a meal. So, how do we get the present generation really interested in what we have been conventionally referring to as semi-classical music? Interested in a way so that they can carry forward the legacy, I mean, of course.

Sri Anindya Banerjee, a disciple of Ustad Ali Akbar Khan, a Sarod and Sursringar player, a noted author and orator, has recently presented a lecture-demonstration on the past and present of thumri. His sessions have attracted some audience, certainly. This seems to be a paradox. If a substantial number of people are interested about listening to a lecture-demostration on thumri, then organizers should be interested in holding more concerts exclusively dedicated to semi-classical music.

Also, composers in Bengal seldom compose raag-based songs today. I have come across exceptions from Sri Rajeeb Chakraborty, Sri Srikanto Acharya, Sri Gautam Ghosal, Sri Uday Bandyopadhyay, Sri Anjan Majumdar, Sri Debasish Ganguly, Sri Anal Chattopadhyay and a few others recently. But these exceptions only prove the rule.

Does it seem that we're just too preoccupied with the idea that something even remotely 'classical' cannot be 'popular'? Are the marketing people conversant enough to comprehend this? Are we forcing a generation to gradually forget what conventional semi-classical music is? Who do we point our fingers at? Singers? Organizers? Sponsors? Listeners? Is there an answer? Is anyone listening?

আনন্দের দিন - কিছু প্রলাপ
তমোজিৎ রায়

সম্প্রতি কলকাতা ভ্রমণকালে দুটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সুযোগ হল। বলা বাহুল্য, দুটি অনুষ্ঠানই গান সম্পর্কিত। প্রথমটি প্রবাদপ্রতিম গায়ক ও সুরকার গৌতম চট্টোপাধ্যায়-এর ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে। আর দ্বিতীয়টি বিশ্ব সঙ্গীত দিবস পালনের উদ্দেশ্যে আয়োজিত। দুটি অনুষ্ঠানেই একটি মিল লক্ষ্য করলাম। অনেক নতুন গায়ক-গায়িকারা আজকাল লোকগান করছেন। খুবই আনন্দের কথা। লোকগানের এই নাগরিক জনপ্রিয়তা ১৯৮০ বা ৯০-এর দশকে অভাবনীয় ছিল। মনে পড়ে ১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে একটি বাউলগানের উৎসব করেছিলাম। সেই বিশাল উন্মুক্ত প্রাঙ্গনের অনুষ্ঠানে টিমটিম করে মাত্র গুটিকয়েক দর্শক উপস্থিত থেকে আমাদের প্রয়াস সার্থক করে তুলেছিলেন। সেই তুলনায় এই দুদিনের অনুষ্ঠানে বিপুল দর্শক আগমন আমায় রীতিমতো উদ্দীপনা যুগিয়েছে।

তবে, প্রশ্ন অন্য জায়গায়। যাঁরা গান গাইছেন তাঁদের নিয়ে। আজকাল ইন্টারনেটের দৌলতে গানের অসীম রত্নভাণ্ডার খুলে গেছে। নানা ওয়েবসাইট ঘাঁটলে প্রচুর গান বিভিন্ন গায়কের কন্ঠে, নানা সাজে সজ্জিত হয়ে আমাদের সামনে সহজেই এসে যাচ্ছে। সুতরাং এখনকার ছেলেমেয়েদের আমাদের মত মেলা মহোৎসব ঘুরে গান সংগ্রহ করতে হয় না। এই ধারাতে সুবিধে হয়তো অনেক। কিন্তু - আমি বিশেষ করে বাউলগানের কথাই বলব, কারণ আমার অনুরাগ ওই গানগুলির প্রতিই বেশি - এতে কোথাও যেন গানের প্রাণশক্তি হারিয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে ভাসে সনাতন দাস, সুবল দাস, গৌর ক্ষেপা বা চিন্তামণি দাসী-র উপস্থাপনা। রাতের পর রাত দেখেছি তাঁরা কীভাবে নেচে, গেয়ে, বাজনা বাজিয়ে হাজার হাজার গ্রামীণ দর্শককে মাতিয়ে রেখেছেন। একচুল নড়তে দেননি তাদের আসন থেকে। এ প্রসঙ্গে চিন্তামণি দাসীর কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে যায়। ছোট্টখাট্টো ৫ ফুট ২ কি ৩ ইঞ্চির গড়ন। বয়সের কারণে মুখে অজস্র বলিরেখা। কপালে শ্বেতচন্দনের রসকলি, চুল চুড়ো করে বাঁধা। পরণে গেরুয়া কাপড়টি আঁটোসাঁটো করে জড়ানো। দেখলে মনে হয় উনবিংশ শতকের কোন কাহিনী থেকে উঠে আসা এক বিধবা পিসীমা। যখন তিনি গান করতে উঠলেন তাঁর হাতে কোন যন্ত্র নেই। এমন কি, সুর ধরে রাখার জন্যে একটি একতারাও না। তারপরে যখন গান ধরলেন তখন দেখা গেল তাঁর আসল রূপ। শুধুমাত্র খালি হাতের তালি সহযোগে গাইতে লাগলেন একটির পর একটি গান। যত লোক সেই আসরে উপস্থিত ছিলেন তাঁরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শেষ অবধি বসে রইলেন বললে কম বলা হবে। সবাই ভেসে গেলেন, মেতে গেলেন ওই প্রৌঢ়া রমণীর গানের তোড়ে। এত জমে গেল সেই আসর যে অনেক তাবড় তাবড় বাউল নেমে পড়লেন মঞ্চে চিন্তামণির সঙ্গে সঙ্গত করতে। শুধুমাত্র সুর আর প্রাণশক্তির জোরে চিন্তামণি জিতে নিলেন অগুন্তি মানুষের হৃদয়। এমন জীবনী শক্তি আর পাই না কেন?

আশির দশকের প্রথমভাগে যাঁরা গৌর ক্ষেপাকে দেখেছেন তাঁরা জানেন কী অসাধারন প্রাণবন্ত ছিল তার গানের উপস্থাপন। একাধিক ঘনিষ্ট সাক্ষাৎকারে তাকে একটা কথা বারবার বলতে শুনেছি। বৈঠকী মেজাজের মানুষ গৌর ক্ষেপা গল্প করতে আর কথা বলতে বড়ই ভালোবাসত। সেই গল্পের মাঝখানে কোন অধৈর্য শ্রোতা যদি বাধা দিয়ে তাকে গান গাইতে অনুরোধ করত, গৌর অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে তাকে বলত, "১২ বছর গুরুর পদসেবা করে তবে কিছু পেয়েছি। আর আপনার ৫ মিনিট ধৈর্য নেই? আমার কথা শেষ করে তবে তো গান গাইব!" এই কথাটি এখানে বলার উদ্দেশ্য এটাই যে সত্যিই আমাদের দেখা এই বাউলরা বহু কষ্ট করে, নানাভাবে তাদের গুরুর সেবা করে, তবে জ্ঞানশিক্ষা পেতেন। একটা জীবনচর্যা থাকত তাঁদের, যা তাঁদের গানে প্রত্যক্ষভাবে প্রতিফলিত হত। আমি শুধুমাত্র গানের দর্শন বা অন্তর্নিহিত গুঢ় অর্থের কথা বলছি না। আমি বলছি যে এই মানুষগুলি গ্রামে, গঞ্জে, ট্রেনে, মেলায়, মহোৎসবে ভিক্ষা করে, গাছতলায় দিন ও রাত্রি যাপন করে তবে এসেছিলেন গানের আঙিনায়। সুতরাং তাঁদের স্বরক্ষেপণে থাকত সেই বলিষ্ঠভাব, সেই শিকড় থেকে উঠে আসা জীবনবোধ। আমার সৌভাগ্য যে আমি বার কয়েক সনাতন দাসঠাকুরের সঙ্গে মাধুকরীতে বার হতে পেরেছি। গৌরের সঙ্গে জয়দেবের মেলায় গাছতলায় রাত কাটিয়েছি। এই রোদে পোড়া, জলে ধোয়া জীবনে প্রতিনিয়ত এঁদের গানে ফুটে উঠতে দেখেছি। তাই বোধহয় এই প্রজন্মের যাঁরা বাউলগান করছেন তাঁদের কাছে প্রত্যাশা অন্যরকম। কেউ বলতেই পারেন যে বাউলগান গাইতে গেলে ওই জীবন যাপন করতে হবে - এর কী মানে আছে? সত্যিই তো কোন মানে নেই। গান তো শুধু গানই। দরকার নেই বাউলদের মতো করে জীবন কাটাবার। তবে তাঁদের গান যদি গাইতেই হয় সেই ভাবটাকে তো আয়ত্ত করার প্রয়োজন আছে। তা না হলে তো কোথায় যেন ফাঁকি পড়ে যায়।

সেদিন গৌতমদার মৃত্যুবার্ষিকীতে অন্য অনেকের সঙ্গে গান গাইলেন কানাই দাস (যিনি অন্ধ কানাই নামেই অধিক পরিচিত) আর গাইলেন বিশ্বনাথ দাস। এঁরা দুজনেই সত্তর পেরিয়েছেন, সম্ভবত আশির কাছাকাছি বয়স। কিন্তু এঁদের চাইতে অনেক কমবয়েসী যাঁরা সেদিন লোকগান শোনালেন, তাঁদের থেকে জীবনীশক্তিতে অনেক বেশি সমৃদ্ধ লাগল এই দুজনের এই বৃদ্ধ বয়সের উপস্থাপন। আসর শেষে বিশ্বনাথদাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, "আচ্ছা, মঞ্চে উঠলে কি এখনো নিজেকে সেই তরুণ বয়েসের বিশ্বনাথ মনে হয়?" অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বিশ্বনাথদার সরল উত্তর - "কী যে হয়ে যায় কে জানে? ওইখানটাতে দাঁড়ালে বয়স, শরীর সব ভূলিয়ে দেয় গো!" এই তো সেই ভাব! এই তো সেই মেজাজ! এরই আকর্ষনে এক সময় বছরের পর বছর জয়দেব, অগ্রদ্বীপ, সোনামুখী, আড়ংঘাটা, খয়েরবনী, নবাসন মেলা থেকে মেলা, আশ্রম থেকে আশ্রমে মোহিত হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। আজ জনপ্রিয়তার মূল্যে কি সেই মেজাজ, সেই ভাব হারিয়ে যাবে কালের অতল গহ্বরে? মনে পড়ে যায় গৌর ক্ষেপার গাওয়া একটি অবিস্মরণীয় গান - "আমাদের আনন্দের আজ দিন বটে! কাজ চলেছে শর্টকাটে ভাই শর্টকাটে"।

রবীন্দ্রসংগীত : কিছু অপ্রিয় কথা
স্বপন সোম

আধুনিক প্রযুক্তির এখন দারুণ রমরমা। ইন্টারনেট - ই-মেল - ফেসবুক - হোয়াটসঅ্যাপ অধ্যুষিত এই স্ম্যেও রবীন্দ্রনাথের গান কিন্তু দিব্যি বেঁচে আছে। যেমনটা রবীন্দ্রনাথ নিজেই ভেবেছিলেন - একে আর কাল অপহরণ করতে পারবে না। আজ যে কোনও সভা-সমিতিতে, আসরে-বাসরে রবীন্দ্রনাথের গানের অনিবার্য উপস্থিতি। তা সে যে কোনও উপলক্ষেই হোক না কেন। আধুনিকমনস্ক এখনকার চলচ্চিত্রেও রবীন্দ্রসংগীত সহজলভ্য। সুতরাং আজ রবীন্দ্রগানের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। তবে কিরকমভাবে বেঁচে আছে রবীন্দ্রনাথের একান্ত সাধনার এই ধনখানি! তার সুর-কথা-ছন্দ কি সর্বত্র অটুট, অবিকৃত? এ প্রশ্নের উত্তর হবে অবশ্যই নঞর্থক। ২০০১ সালে কপিরাইট চলে যাবার পর কিছু কিছু বিকৃতি ঞ্জ্রে এসেছে, বিশেষত সুরে-ছন্দে। আবার এও ঠিক, কপিরাইট থাকাকালীন অবস্থাতেও রবীন্দ্রসংগীতের প্রকাশিত স্বরলিপি ও তার রেকর্ডে রূপায়ন নিয়ে বিভ্রান্তিকর ঘটনা যে কিছু ঘটেনি তা নয়। তর্কাতর্কিও হয়েছিল। এর মধ্যে শান্তিনিকেতনে প্রশিক্ষিত শিল্পীর রেকর্ড আছে, আছে বাইরের শিল্পীর রেকর্ডও।

কপিরাইট চলে যাবার আগের পর্বে একটু চোখ রাখা যাক। কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় 'আনন্দধারা বহিছে ভুবনে' রেকর্ড করেছিলেন রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশিক্ষণে - তার সুর কিন্তু স্বরবিতান ৪৫-এ প্রকাশিত গানটির স্বরলিপির সঙ্গে মেলে না। বহুদিন বাদে ২০০৩ সালে স্বরবিতান ৬৪-তে যুক্তিযুক্তভাবেই কনিকার গাওয়া গানটির স্বরলিপি প্রকাশিত হয় যা করেছিলেন ভি. বালসারা। সুচিত্রা মিত্র প্রথমবার যখন 'যদি তোর ডাক শুনে' রেকর্ড করেন তখন স্থায়ীতে দ্বিতীয় লাইনে - 'রে তবে'-তে 'সা রা মা । মা পা -া' এই স্বরবিন্যাস (স্বরবিতান ৪৬) ছাড়াই রেকর্ড করেন এবং তা বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড অনুমোদনও করেছিল। মিউজিক বোর্ড অনুমোদন দিলে সে-সুরকে প্রামাণ্য ধরে নিতে হয় এবং স্বরলিপি-গ্রন্থে সুরান্তর হিসেবে তার স্থান পাওয়া উচিৎ। যা হোক, পরে যখনই সুচিত্রা মিত্র গানটি গেয়েছেন স্বরলিপি অনুযায়ীই গেয়েছেন।

স্বরলিপি-রূপায়ন, যন্ত্রানুষঙ্গ - এসব নিয়ে পুরনো সে পর্বে প্রধান অভিযুক্ত দেবব্রত বিশ্বাস। মূলত রেকর্ডে তাঁর গান ও যন্ত্রায়োজন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। দেবব্রত প্রথাগতভাবে কারুর কাছে শেখেননি। তবে স্বরলিপিতে তাঁর দক্ষতা ছিল - সেই অনুযায়ী প্রথমে এইচ এম ভি-কলম্বিয়াতে, পরে হিন্দুস্তানে রেকর্ড করেছেন। মিউজিক বোর্ড দু'একটি গানের রেকর্ডের ক্ষেত্রে স্বরলিপি ও তার রূপায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুললেও শেষ পর্যন্ত সেসব আপত্তি টেঁকেনি। মিউজিক বোর্ড তাঁর কিছু গানে যন্ত্রায়োজন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল - যেমন 'পুষ্প দিয়ে মারো যারে'। যন্ত্রায়োজনে দেবব্রত নতুন ভাবনার পথিক, তাই আধুনিক যন্ত্রাদি তাঁর রেকর্ডে বেজেছে। এ-প্রসঙ্গে স্বতই মনে পড়ে শান্তিনিকেতনে প্রশিক্ষিত সুবিনয় রায়ের 'এ কি সুধারস আনে'-তেও পিয়ানো অ্যাকর্ডিইয়ান এবং কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয়বার রেকর্ড-করা 'আনন্দধারা বহিছে ভুবনে'-তে আধুনিক যন্ত্রাদি ব্যবহৃত হয়েছে। দেবব্রতর ক্ষেত্রে আরেকটি অভিযোগের জায়গা হল তাঁর গায়ন-অভিব্যক্তি। যথার্থ এক শিল্পীর নিজস্ব একটা গায়নভঙ্গি তো থাকবেই। দেবব্রত ১৯৭১-এ রেকর্ড করা বন্ধ করেন এই প্রতিবাদে যে অভিজ্ঞতা, বয়স - সব দিক দিয়েই কনিষ্ঠ শিল্পীরা তাঁর গানের বিচারক হলেন মিউজিক বোর্ডের পক্ষে। তারপর বিভিন্ন ঘরোয়া আসরে কখনও দুখে-অভিমানে কখনও বা একটু মজা করে তিনি রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছেন সুরের একটু হেরফের ঘটিয়ে। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বাজারদর দেখে তাঁর যেমন-তেমন-ভাবে গাওয়া গানও একাধিক কোম্পানি বাজারে প্রকাশ করলেন অযৌক্তিকভাবে - এতে শিল্পী দেবব্রত সম্পর্কেই একটা ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়।

একটা ব্যাপার লক্ষ্যণীয় যে, কিছু রবীন্দ্রসংগীত শান্তিনিকেতনে যেভাবে গাওয়া হয় তার সঙ্গে স্বরলিপির কোনও কোনও অংশ মেলে না। যেমন ধরা যাক - 'ঐ আসনতলে মাটির পরে' গানটি। শান্তিদেব ঘোষ স্থায়ীতে - 'তোমার চরণ ধূলায় ধূলায়' একটু অন্যরকম করেন, সে সূত্রে সুচিত্রা মিত্রও। সুরের এই ব্যত্যয় ঠিক ইচ্ছাকৃত বা বাণিজ্যিক নয়, পরম্পরাগতভাবেই চলে এসেছে। তবে সাধারণভাবে এগুলি পরিহার করে প্রকাশিত স্বরলিপিকেই মেনে চলা দরকার যাতে বিভ্রান্তি না বাড়ে যেহেতু রবীন্দ্রসংগীত এখন একটা অ্যাকাডেমিক স্তরে চলে এসেছে। আর পরিবর্তিত সুরে যদি রেকর্ড প্রকাশিত হয় বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের অনুমোদনক্রমে, তাহলে পরিবর্তিত সুরের স্বরলিপি প্রকাশ করা দরকার - যেমনটা বেরোল কনিকার 'আনন্দধারা বহিছে ভুবনে'-র স্বরলিপি ২০০৩-এ।

কপিরাইট চলে যাবার পর রবীন্দ্রনাথের গানে যে বিকৃতিগুলি ঘটানো হল পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আধুনিকতার নামে তা সম্পূর্ণতই বাণিজ্যিক। এবং তার মধ্যে সংগীতবোধের কোনও পরিচয় মেলে না। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে, সিডি-ভিসিডি তে, বিকৃতভাবে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া হচ্ছে। ইউটিউব খুললেই এসবের পরিচয় মিলবে।

বছর কয়েক আগে 'বং কানেকশান' নামের চলচ্চিত্রে নীল দত্তের সংগীত পরিচালনায় শ্রেয়া ঘোষাল এবং নচিকেতা গাইলেন সুপ্রিচিত রবীন্দ্রসংগীত 'পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে'। গানটির ছন্দ বদলে ফেলা হল। ৬ মাত্রার দাদরার পরিবর্তে ৮ মাত্রার কাহারবায় গানটি গাওয়া হল। সুরেও কিছু বিচ্যুতি লক্ষণীয় যেমন - 'বৃষ্টি-নেশা-ভরা সন্ধ্যাবেলা'-তে। সেছাড়াও ভোকাল রিফ্রেনে এক আশ্চর্য 'উল্লালা উল্লালা' ধ্বনিও ব্যবহৃত হয়। এতসবের কী মানে এবং কেন? আর এক ছবি 'বেডরুম'-এ সোমলতা আচার্য চৌধুরী আশ্চর্যজনকভাবে এবং অবশ্যই অবলীলায় স্বরলিপি-বহির্ভূত এক কোমল স্বর ব্যবহার করলেন 'মায়াবনবিহারিণী' গানের স্থায়ীতে। তাছাড়া আভোগে 'তারে আমি সাধিব'-তে 'পা ধা । ধা র্সা । র্সা না । র´ র্সা...' র জায়গায় গাওয়া হয় 'পা গা র্সা । র্সা র্সা র্সা না । র´ র্সা ... ।'

বিশিষ্ট উচ্চাঙ্গসংগীতশিল্পী অজয় চক্রবর্তী একবার রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করলেন এবং কিছু স্বেচ্ছাচারিতার নজীর রাখলেন। 'আজি এই গন্ধবিধুর সমীরণে' গানে এমন কিছু করলেন স্বরলিপিতে নেই। যথা - অন্তরার শেষে স্থায়ীতে ফেরার সময় 'মনে'- তে স্বরলিপি অনুযায়ী স্বরবিন্যাস - 'র্সাণ -া র্সা া', অথচ অজয় তাকে লম্বা মীড় দিয়ে নামিয়ে আনেন 'দা'-তে, তারপর স্থায়ী গান। 'ও কেন ভালোবাসা' গানে 'সখী' শব্দটি যোগ করেন এবং এই প্রক্ষিপ্ত শব্দটি নিয়ে সুরবিহারও করেন। কোনও কোনও শিল্পী আবার অহেতুক আলাপ করছেন গানের আগে। যেমন রাঘব চট্টোপাধ্যায় 'মন মোর মেঘের সঙ্গী'-তে কিংবা রশিদ খাঁ 'রাখো রাখো রে জীবনে' গানে। আলাপের মাধ্যমে গানের কী উন্নতি হয় কে জানে! এখন এই এক প্রবণতা সংক্রামক রোগের মতো ছড়িয়ে পড়েছে - উচ্চাঙ্গসংগীতের সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীতের সম্পর্ক দেখানো। রবীন্দ্রসংগীতকে জাতে তোলার চেষ্টা আর কি! সিডিতে-অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হচ্ছে হিন্দুস্থানী বন্দীশ, সেইসঙ্গে সেই বন্দীশ থেকে ভাঙা রবীন্দ্রসংগীত। অথবা হিন্দুস্থানী বন্দীশের পর সেই রাগনির্ভর রবীন্দ্রনাথের গান। গলার কারুকার্য দেখানোর এমন সুযোগ কে ছাড়ে! রবীন্দ্রনাথের গানে উচ্চাঙ্গসংগীতের প্রভাব দেখাতে গিয়ে শিল্পীর গলার কাজ দেখানোটাই বড় হয়ে পড়ে। শ্রোতারাও উল্লসিত। রবীন্দ্রনাথ উচ্চাঙ্গসংগীতকে ভিত্তি ক্রেই গানরচনা করলেও তার শৃঙ্খল থেকে বেরোতেই চেয়েছেন, চেয়েছেন একেবারে স্বকীয় ধরণে গান সৃষ্টি করতে। আর উচ্চাঙ্গসংগীতের সুরবিহার বা ইম্প্রোভাইজেশনকে তিনি একেবারেই স্থান দেননি তাঁর গানে। রবীন্দ্রনাথ প্রথাগতভাবে উচ্চাঙ্গসংগীত না শিখলেও বহু গুণী ওস্তাদের সঙ্গ করেছিলেন, গান শুনেছিলেন আর তাকে আত্মিকরণও করেছিলেন। পরিণত বয়সের বিভিন্ন গানে রাগমিশ্রণ দেখেই বোঝা যায় রাগসংগীতে তাঁর কেমন অধিকার ছিল।

সময়ের স্রোতে স্বাভাবিকভাবে গাইবার ধরণ যেমন পাল্টায় তেমনই বদলাতে পারে যন্ত্রায়োজনও। কিন্তু আজকাল কোনও কোনও ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার এমনই লাগামছেঁড়া, যা সংশ্লিষ্ট গানের মেজাজ নষ্ট করে শ্রবণকে পীড়িত করে। 'কালপুরুষ'-এর 'রবিবক্স' নামের অ্যালবামে সহজ লোকায়ত সুরের 'গ্রামছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ' গানে তারস্বরে গিটার বাজতে থাকে, সেইসঙ্গে প্যাড। রাঙামাটির পথটা মন ভোলানোর বদলে অনেক দূরে হারিয়ে যায়। রশিদ খাঁ-নচিকেতার এক অ্যালবামে 'এ কী লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ' গানে অন্তরায় হঠাৎ প্যাড প্রবেশ করে। প্যাড কি এসব গানে সমঞ্জস? বরং 'পুরানো সেই দিনের কথা' বা 'প্রাণ চায় চক্ষু না চায়' ধরণের গানে প্যাড বাজতে পারে, তবে অবশ্যই সংযতভাবে। যন্ত্রানুষঙ্গে যেটা দরকার তা হল গানের মেজাজ অনুযায়ী যন্ত্র নির্বাচন। দেখতে হবে যন্ত্রের ব্যবহার যেন গানের মেজাজকে নষ্ট না করে। এখন অনুষঙ্গে কি বোর্ড সর্বাত্মকভাবেই উপস্থিত। তাতে ক্ষতি নেই। কি বোর্ডে বাজানো কর্ড গানের পরিবেশনকে সাহায্যই করবে। এস্রাজ প্রয়োজনীয় যন্ত্র কিন্তু মুস্কিল হল ক'জন ঠিকঠাকভাবে সুরে এস্রাজ বাজাতে পারেন! অধিকাংশই প্পারেন না, ফলে গান ক্ষতিগ্রস্ত হয় - ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাই বলে। মোট কথা যন্ত্র নিয়ে কোনও ছুঁৎমার্গের দরকার নেই। প্রয়োজন সংগীত আর রসবোধের। সুবিনয় রায়ের সঙ্গে একাধিকবার রবীন্দ্রসংগীতের নানা ব্যাপার নিয়ে কথা হয়েছিল বিভিন্ন সময়। যন্ত্রানুষঙ্গ বিষয়ে তিনি বলতেন - যে কোনও যন্ত্রই সংযমী ও বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহারে ভাল ফল দিতে পারে।

এখন বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বা সিরিয়ালে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশিত হচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা জাচ্ছে ঠিকমতো গাওয়া হচ্ছে না, সুরের খুঁটিনাটির দিকেও একেবারেই নজর দেওয়া হচ্ছে না। আমার স্ত্রী দেবারতির একটা অভিজ্ঞতার কথা এই সূত্রে বলি। ওর এক ছাত্রী একবার ওর কাছে এসে 'ওহে সুন্দর মম গৃহে আজি' গানটি শিখতে চায়। দেবারতি ভাবে - এই মেয়েটি তো রবীন্দ্রনাথের গান ভালো জানে না - 'ওহে সুন্দর' গানটি পপুলার নয়, তাহলে! যা হোক - গানটি যখন দেবারতি করছে বা শেখাচ্ছে তখন ছাত্রীটি অবাক। এত সূক্ষ্ম অলংকরণ তো সে শোনেনি। গানটিতে এক এক মারায় দু'তিনটি স্বরের সূক্ষ্ম অলংকরণ আছে যা আয়ত্ত করতে বহু চর্চার দরকার। ছাত্রীটিকে কোথায় শুনেছে গানটি জিজ্ঞেস করাতে সে বলে এক সিরিয়ালের কথা। রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে সেই ধারাবাহিকটি অনেকদিন ধরেই চলেছিল একটি চ্যানেলে। এই হচ্ছে অবস্থা। ঠিকমতো গান না-শিখে, স্বরলিপি না মেনে এইভাবে বিভিন্ন সিরিয়ালে চলেছে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া। আসলে সঠিক শিক্ষা না করেই চটজলদি নাম-করার আর অনুষ্ঠান করার প্রবণতা এখন সংক্রামক রোগের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। পয়সা বা প্রতিপত্তির জোরে সবই হচ্ছে এখন। চ্যানেলে চ্যানেলে সকাল-সন্ধের বৈঠকে বসে পড়া যাচ্ছে! অনুষ্ঠান করা যাচ্ছে রবীন্দ্রসদন-শিশির মঞ্চ, বা অন্যত্র। টিভি চ্যানেলে নিয়মিত মুখ না দেখা গেলে তিনি শিল্পী হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছেন না। শিল্পীর গানের মান নয়, কোনও চ্যানেলে বিশেষ কোনও অনুষ্ঠানে হাজির থাকার সংখ্যাতত্ত্বের ওপর ওঠানামা করছে গায়ক-গায়িকাদের বাজারদর!

একটা সময় বিভিন্ন মুদ্রণ প্রচার মাধ্যম রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে বেশ সদর্থক কাজ করেছিল। বিশেষত দেশ (তখন সাপ্তাহিক), স্টেটসম্যান, আনন্দবাজার পত্রিকা, আজকাল। এইসব প্ত্রিকায় প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনের সূত্রে উঠে এসেছেন বেশ কিছু প্রতিভাবান শিল্পী। সেসময় এই সমস্ত পত্রিকায় প্রকাশিত সমালোচনার একটা মূল্য ছিল। আজ কিন্তু তা একেবারেই অন্তর্হিত। এখন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সমালোচনার মান খুবই নিম্নস্তরের। পড়লেই বোঝা যায় প্রতিবেদকের সীমাবদ্ধতাটুকু। অযোগ্য গায়ক-গায়িকাদের ওপর যথেষ্টই কৃপা বর্ষিত হয় দেখতে পাই, এমন কী ছবিও বেরিয়ে পড়ে। এভাবেই সমালোচনার গুরুত্ব কমে যায় আর সংস্কৃতিও এক পা এগোয় না।

পরিশেষে রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে মহার্ঘ সম্পদ। কত বছরের নিবিড় সাধনায় এক স্রষ্টা সৃষ্টি করে গেছেন, আমরা তাকে রক্ষা করতে পারব না! আসুন আমরা সকলে সচেতন হই, উদ্যোগী হই। যিনি বা যাঁরা রবীন্দ্রগানের কথা-সুরকে বিকৃত করছেন আমরা তাঁদের বর্জন করব। এঁরা বরং নিজেরা গান লিখে, সুর দিয়ে বাংলা গানকে আধুনিক করার প্রয়াস করুন। তবে এটাও ঠিক, ঠিকঠাক সুরে-তালে গাওয়ার প্রয়াসটাই বেশি নজরে পড়ে। বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ থেকে অদ্যাবধি ৬৬টি খণ্ড স্বরবিতান বেরিয়েছে। বিশ্বভারতীর সর্বাধিক বিক্রিত গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম এই স্বরলিপি-গ্রন্থ স্বরবিতান। অর্থাৎ মানুষ প্রামাণ্য কথা-সুরকে মেনেই চলতে চাইছেন। এটা খুবই আশাব্যঞ্জক। মানে সবটাই অন্ধকারময় নয়, তাঁর মাঝেই আছে আলোর ইশারা।

রবীন্দ্র সার্ধশতবর্ষে 'মিউজিক' আয়োজিত আন্তঃ-স্কুল রবীন্দ্রসংগীত প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন অদ্রিকা সরকার। অদ্রিকা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। সঙ্গে গানও চলছে। 'মিউজিক'-এর পত্রিকার জন্য অদ্রিকা সাক্ষাৎকার নিলেন তাঁর গুরু, রবীন্দ্রসংগীত ও শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী শৌণক চট্টোপাধ্যায়ের।

শৌণক চট্টোপাধ্যায়-এর সাক্ষাৎকার নিলেন অদ্রিকা সরকার

অদ্রিকার কথা - ছাত্রী হিসেবে টুকরো টুকরো কথা প্রতিটি ক্লাসেই আমি শুনতে পাই। সেই কথাগুলো নিয়ে মনে মনে সাজাতে সাজাতে বহু ফাঁকও থেকে যায়। মূলত এই ফাঁক পূরণের তাগিদ এবং আরও জানবার কৌতূহল থেকেই এই সাক্ষাৎকার।

অদ্রিকা - যতদূর জানি বাড়িতে জেঠু, জেঠিমা কেউ গান করেন না। বাড়িতে গানের পরিবেশ না থাকা সত্ত্বেও তোমার মধ্যে গানের ঝোঁক এল কীভাবে?

শৌণক - পরিবেশ বাড়িতে খুবই ছিল। প্রফেশনালি গানবাজনা আমার বাবা-মা করতেন না। তবে বাড়িতে রেকর্ডের যুগে রেকর্ড আর ক্যাসেটের যুগে ক্যাসেট প্রচুর কেনা হত। বাবা তাঁদের বিয়ের তারিখে প্রতি বছর গুচ্ছ গুচ্ছ রেকর্ড কিনে আনতেন মায়ের জন্য। ফলে গানবাজনার মধ্যে থাকা, ভালবাসা ছোটবেলা থেকেই ছিল।

অদ্রিকা - তোমার শাস্ত্রীয় সংগীতের গুরু উস্তাদ মুশকুর আলি খান সাহেব। সেই শাস্ত্রীয় সংগীতের পরিবেশ থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতি আগ্রহ জন্মায় কীভাবে?

শৌণক - আমার গান শেখা শুরু ১৯৮৬ সালে। প্রথমে লীনা চক্রবর্তী নামে এক ভদ্রমহিলা বাড়িতে এসে শেখাতেন। তারপর ১৯৮৮ তে আমি গুরুজির কাছে শিখতে শুরু করি। আমার ১২ বছর বয়সে গুরুজি নাড়া বাঁধেন। রবীন্দ্রনাথের গান তো অনেকদিন ধরেই গাই। শিখব, সেটা ভাবিনি। শেখার আগে আমার অন্তত ৫০০ থেকে ৬০০ গান মুখস্থ ছিল। মানে সলতে পাকানোর কাজটা হয়ে রয়েছিল। তখন মনে হল এবার এটা নিয়ে প্রথাগতভাবে শিক্ষা শুরু করলে কেমন হয়। পেশাগতভাবে কিছু গাইতে গেলে সেটা প্রথাগতভাবে শেখা উচিৎ। শিক্ষা ছাড়া কিছু হয় না। পরম্পরাগত শিক্ষা শুরু করলাম প্রথম স্বাগতাদির কাছে। সম্ভবত ২০০২ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত স্বাগতাদির কাছে শেখা। তারপর একটা স্কলারশিপের জন্য এক বছরের বিরতি। তারপর প্রমিতা মাসির কাছে শেখা।

অদ্রিকা - রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে মূল গান কিংবা সেই রাগের বন্দিশ গাওয়া - এটা তোমার হাত ধরেই শুরু বলা যায়। তোমার কাছে শিখতে গিয়ে দেখেছি তুমি এটাকে 'বদ-অভ্যেস' বলে রসিকতা কর। এটা কীভাবে মাথায় এল?

শৌণক - প্রথমত, মূল গান-ভাঙা গানের উপস্থাপনা করার প্রচলন আদৌ আমার হাত ধরে শুরু হয়নি। তার ঢের আগে শুরু হয়েছে। আমি ঠিক করে ইতিহাসটা বলতে পারব না। যতদূর মনে পড়ছে, রবীন্দ্রনাথের আমলেই বিভিন্ন গানে, বিশেষ করে বর্ষামঙ্গলের অনুষ্ঠানে এইভাবে তাঁর গানের উপস্থাপনা হয়েছে। ১৯৮০-র দশকে 'রূপান্তরী' অ্যালবাম বেরিয়েছে। সুচিত্রা মিত্র আর আমজাদ আলি খান সাহেব একসঙ্গে একটা কাজ করেছেন।

হ্যাঁ, যদি এরকম হয় যে বাধ্যতামূলকভাবে আমাকে রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে গেলে আগে একটা বন্দিশ গাইতেই হবে, তাহলে সেটা বদ-অভ্যেস। যদি আমার মতো শিল্পীর একমাত্র অপশন হয়ে থাকে যে বন্দিশ দিয়ে না গাইলে অনুষ্ঠানে গান গাইতে পারছে না বা সেটা শোনার যোগ্য হচ্ছে না, তাহলে সেটা বদ-অভ্যেস। না হলে সেটা বদ-অভ্যেস হওয়ার কিছুই নেই। ওটা নেহাতই রসিকতা।

অদ্রিকা - এতদিন ধরে আমরা যেভাবে রবীন্দ্রনাথের গান শুনে এসেছি তার থেকে তোমার সিডি 'নূতন ও সনাতন'-এ তুমি অন্যভাবে উপস্থাপন করেছ। সেটা করতে গিয়ে সমালোচনার ভয় হয়নি?

শৌণক - সমালোচনা...!!! (একটু ভেবে) হ্যাঁ, আমি প্রথম দিকে কিছুটা ভিতু ছিলাম যে কে কী বলবে। এখন নই। হ্যাঁ, যাঁরা খুব একটা রবীন্দ্রনাথের গান শোনেন না, বা যাঁদের এই গান প্যানপ্যানে মনে হয় তাঁরা অনেকেই আমাকে ফিডব্যাক দিয়েছেন যে তাঁরা আবার এই গান শুনছেন। আমি এটার সেরকমভাবে কোনও পরিসংখ্যান দিতে পারব না।

অদ্রিকা - সমসাময়িক শিল্পীদের থেকে এই কাজ করতে গিয়ে কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া পেতে হয়েছে?

শৌণক - এ ব্যাপারে সমালোচনা খুবই সামান্য, স্বীকৃতিটাই বেশী পেয়েছি। আমি যতদূর জানি, আমার কয়েকজন সমসাময়িক শিল্পী, যারা আমার বন্ধুও বটে, তারা আমার এই কাজকে সম্মান করেন। আর এছাড়া বাধা এক-আধটা ক্ষেত্রে হয়েছে, সেটা আমি বলতে চাই না।

অদ্রিকা - তুমি তো শুধু রবীন্দ্রসংগীত গাও, আবার বন্দিশ সহযোগেও গাও। কোনটা বেশী জনপ্রিয় হয়েছে বলে তোমার মনে হয়?

শৌণক - দুটোই জনপ্রিয়। এক-একজন শিল্পী এক একদিকে চিহ্নিত হয়ে যান। শ্রোতারা তখন তাকে সেটাতেই বেশী গ্রহণ করতে চান। তবে আমি একাধিক অনুষ্ঠানে সবরকম গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয় সবটাই সবাই শোনেন।

অদ্রিকা - এখন তো ইউটিউব, ডাউনলোডের যুগ। অ্যালবাম বিক্রি আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও সেইসঙ্গে কমছে। এই ব্যাপারে তোমার নিজের গানের ক্ষেত্রে কী বলার আছে?

শৌণক - আমরা, যারা পেশাগতভাবে গানবাজনা করি, তারা তো শখে করি না। ফলে বাণিজ্যিক দিকটা অগ্রাহ্য করতে পারিনা। আর আমার মতে ওটা অগ্রাহ্য করা উচিতও নয়। তবে আমি যতই ঝিনচ্যাক কিছু করি না কেন, তার মধ্যে একটা রুচিবোধ, ভাবনাচিন্তা আছে। তাই কখনই আমি আমার কাজটাকে কোনও একটা জোলো কাজের সঙ্গে গুলোই না। সেই আত্মবিশ্বাসটুকুও আমার আছে। আর সুস্থ বাণিজ্য হওয়া দরকার। ফলে এই যুগে দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে আমার কাজ পৌঁছলে, সে যে উপায়েই হোক না কেন, আমার কোনও আপত্তি নেই।

অদ্রিকা - তোমার গান শুনে জয় গোস্বামী বলেছিলেন - "এই প্রজন্মের সবছেয়ে প্রস্তুত শিল্পী" - তোমার নিজের কী মনে হয়?

শৌণক - না, আমার কিছু মনে হয় না। প্রত্যেকের নিজস্ব কিছু ভালমন্দ দিক থাকে। জয়কাকু রাগসংগীতের অসম্ভব অনুরাগী। সেই জায়গা থেকে হয়ত ওনার মনে হয়েছিল যে আমি রবীন্দ্রনাথের গান এবং শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে কাজ করছি বা শিখছি। সেই দিক থেকে ভেবেই হয়ত উনি বলেছিলেন।

অদ্রিকা - প্রচারের আলো তোমার সমসাময়িক কয়েকজন গায়ক-গায়িকার মুখে খুব জোরালোভাবে পড়েছে। তোমার কি মনে হয় যে তোমার গুণগ্রাহীদের তোমার থেকে আরেকটু বেশী আশা ছিল?

শৌণক - সেটা আমি কী করে বলব? সেটা তো গুণগ্রাহীরাই বলতে পারবেন। এটা একটা গুরুতর বিষয়। আমরা সকলেই চাই এক নম্বর হতে। সেটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। দোষেরও নয়। তো সেই বোকামির সময়টা আমি ফেলে এসেছি। এখন আমার একটাই কথা মনে হয়, যে মানুষ যদি আমায় শিল্পী হিসেবে গ্রহণ করেন তবে আমার পক্ষে সুস্থভাবে গানবাজনাটা করা সম্ভব হবে।

অদ্রিকা - কিছুদিন আগে ঋতুপর্ণ ঘোষের পরিচালনায় 'গানের ওপারে' ধারাবাহিকটা বিপুল জনপিয়তা পায়। সেখানে রবীন্দ্রনাথের গানকে নতুনভাবে উপস্থাপনা করা হয়। সেগুলো যদি তুমি শুনে থাকো, কেমন লেগেছে?

শৌণক - খুব খারাপ লেগেছে। যদি Titanic-এর 'Every night in my dreams' মানুষ টপ্পা অঙ্গে বা ঢালা গান হিসেবে না নিতে পারেন তাহলে রবীন্দ্রনাথের গানকেও তার মতো করেই নিতে হবে। ('Every night in my dreams' টপ্পা অঙ্গে গেয়ে দেখালেন!)

অদ্রিকা - দেশে-বিদেশে প্রচুর অনুষ্ঠান করেছ। শ্রোতারা তোমাকে রবীন্দ্রনাথের গানে আর শাস্ত্রীয় সংগীতে বেশী পেয়েছেন। হাল আমলের গান গাইতে ইচ্ছে করে না।

শৌণক - প্রথমত সবরকম গান আমি গাইতে পারব না। তবে ইচ্ছে করে। এইজন্যই ইচ্ছে করে যে যেসব ব্যতিক্রমী অলঙ্করণ বা vocal experiment আমি রবীন্দ্রনাথের গানে করতে পারিনা বা সচরাচর করি না, সেগুলো আমি অবশ্যই করতে চাইব।

অদ্রিকা - তুমি কবিতা বোঝ কী করে?

শৌণক - কিছুটা অভ্যেস। আর আমার মা আমাকে এই বিষয়ে সাহায্য করেন।

অদ্রিকা - গানের জন্য জীবনে কোন কোন ক্ষেত্রে ত্যাগ স্বীকার করেছ?

শৌণক - নিশ্চিত চাকরি হয়ত বা জুটেও যেত। পড়াশোনায় খুব খারাপও ছিলাম না। আর্থিক দিক থেকে ত্যাগ স্বীকার আমার মনে হয় সবচেয়ে বড়ো ত্যাগ স্বীকার। যদিও খারাপ নেই এখনও। জীবনে নাটকীয় মোড় কিছুই নেই। একটা বাণিজ্যিকভাবে সফল গান করে আনন্দ পুরস্কার পাওয়ার মতো কোনও ঘটনা আমার সংগীতজীবনে নেই। আমার সবটাই একটা ক্রমিক উত্থান।

বরং আমি বলব আমি আজ যেখানে, সেখানে আমাকে নিয়ে আসতে গিয়ে আমাকেই সমস্ত সুযোগ সুবিধে দিয়ে নিজেরা ত্যাগ স্বীকার করবার ব্যাপারে আমার বাবা-মা আনেক এগিয়ে আছেন।

অদ্রিকা - ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

শৌণক - (হেসে) বিয়ে না করা। আসলে ওরকম কিছু পরিকল্পনা নেই। গানবাআজনায় যতটুকু আমার পক্ষে ভাল করে করা সম্ভব সেটাই করব।

জগৎ জোড়া জাল আর গানবাজনার হাল
নির্মাল্য ভট্টাচার্য

"পরিবর্তনই একমাত্র স্থায়ী"। বেশ সদর্থক বাক্য। বর্তমান কর্পোরেট দুনিয়া বা ব্যক্তিগত মূল্যায়ন এবং মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে এই ক'টি শব্দের ভরপুর প্রয়োগ হয়। কিন্তু বাস্তবিকভাবে সব ক্ষেত্রে এটিকে সদর্থক বলে ধরা যায় কি? তর্কভেদে হয়ত যায়, কিন্তু সংগীতশিল্প অন্তত এই বাক্যকে মেনে নেয়নি। বেশ চলছিল রেকর্ড থেকে ক্যাসেট, ক্যাসেট থেকে সিডি, সিডি থেকে হয়ত ডিভিডি... বাধ সাধলো ইন্টারনেট তার দাতা কর্ণ রূপ ধরে উপস্থিত হয়ে। Worldwide web বা www - যাকে আমি বলে থাকি জজজ বা জগৎ জোড়া জাল, তার প্রবেশের মাধ্যমে তাঁতি আর এঁড়ে গরুর প্রবাদটাকে ভয়ানকভাবে স্থাপিত করলো।

প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে প্রয়োজন ফুরলো সিডি কেনার। বেশ সুবিধাই হয় যখন পাড়ার বা কলেজের বা অফিসের এক বন্ধু দশ দোকান ঘুরে কিনে আনলো উস্তাদ আমীর খানের মারোয়া, আর আমি...? আমিও সেই গানের মালিক। না, না, কিনতে হয়নি। সিডি-টার থেকে দিব্যি পেয়ে গেছি তার MP3 version। ইন্টারনেট এসে সব ব্যবস্থাকে আরও ত্বরান্বিত করলো। এখন আর কোনও গান খুঁজতে হলে অন্তত ৮০ শতাংশ মানুষ সিডি-র দোকানে যায় না। ইউটিউবে খুঁজলেই হল। নেহাতই যদি কেউ শ্রী বেচু দত্ত-র প্রথম রেকর্ডিং না খোঁজেন, সচরাচর শুনতে চাওয়া গানের মধ্যে সবই বেশ বিনামূল্যেই পাওয়া যায়। ফলশ্রুতি কী? সংগীতশিল্পীরা তাঁদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁদের গানের রয়্যালটি আর পাওয়া যাচ্ছেনা। বিভিন্ন social networking site এবং app এসে একটি একই সময়ে পৌঁছে যাচ্ছে একাধিক ব্যক্তির মুঠোফোনে। প্রযুক্তি উন্নতি করলেও তা কিন্তু এই অরাজকতা বন্ধ করার কোনও উপায় খুঁজে পাচ্ছেনা।

কিন্তু, সবটাই কি মন্দ? বোধহয় না। এই ইন্টারনেটই অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠছে একজন শিল্পীর প্রিয়তম বন্ধু। বিশেষ করে যেসব সংগীতশিল্পীরা স্বাধীনভাবে কাজ করছেন, তাঁদের কাছে এই উপায় হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। কোনও প্রতিষ্ঠানের তকমা ছাড়াই এবং তথাকথিত "সংগীত জগৎ"-এর বাসিন্দা না হয়েও তাঁদের শিল্পসৃষ্টি পৌঁছে যাচ্ছে সহস্রাধিক মানুষের কাছে। নিজেদের লাভের গুড় নিজেরাই খাওয়া যাচ্ছে। ভাগ করে নিতে হচ্ছে না কোনও গান ব্যবসায়ীর সাথে। অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পী যাঁরা এক সময় ক্যাসেট, সিডি করেছেন এখন বার করছেন তাঁদের singles। এক একটি গান যা ইউটিউবের মতো মাধ্যমের সাহায্যে জনপ্রিয় হচ্ছে।

রোজকার জীবনের মতো গানের জগতকেও পাল্টে দিয়েছে ইন্টারনেট প্রভূতভাবে। যে পরিবর্তন নঞর্থক আবার সদর্থকও। একটি কথা নিশ্চিত : ইন্টারনেট চলে যাবে বলে আসেনি, বরং তার পাখা মেলবে অনেক বেশী করে। সংগীত জগতকেই তার হাত ধরতে হবে। উপায় খুঁজতে হবে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার। ইতিহাস যদি বর্তমানের নির্দেশক হয়, তবে এই সমস্যাও একদিন স্তিমিত হবে। সময় ঠিক বুঝিয়ে দেবে ইন্টারনেট অনেক বেশী বন্ধু, শত্রু নয়।

'মিউজিক'-এর বারান্দায় 'রোদ্দুর'
তাদের সঙ্গে কথোপকথনে স্নিগ্ধদেব সেনগুপ্ত

সমন্বিতা, অনস্মিতা, গৌরব আর সুরদীপ - ওরা চারজন শ্রী গৌতম ঘোষালের কাছে গান শেখে। শেখে হয়ত আসলে সংগীত আর জীবন সংক্রান্ত আরও অনেক কিছুই। ওরা সম্প্রতি ঠিক করেছিল যে শ্রী গৌতম ঘোষালের কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী একটা অনুষ্ঠানে গান করবে। কী গান হবে, কেমন করে হবে, সেসব ভাবতে ভাবতে ওদের মনে হল যে একটা দল হিসেবে মঞ্চে এলে কেমন হয়? ওরা এককভাবে যখন মঞ্চে গান করে তখন বাংলা, হিন্দি সবই শোনা যায়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ওদের মনে হল শুধুমাত্র বাংলা গান নিয়েই কিছু করা যাক। শ্রোতারা বিনোদনের খোঁজে ওদের গান শুনতে আসেন, যে গান তত জনপ্রিয় নয় সেগুলো সবসময় শোনানোর উপক্রম হয় না। কিন্তু ওরা চারজনেই বাংলা গান গাইতে খুব পছন্দ করে। বিশেষ করে এমন অনেক নতুন বাংলা গান আছে যা চাইলেও ওদের মঞ্চে গাওয়া হয়ে ওঠে না। এইসব ভাবতে ভাবতেই ওরা একজোট হল। আমরা পেলাম প্রতিশ্রুতিতে উজ্জ্বল 'রোদ্দুর'-কে। সম্প্রতি ত্রিগুণা সেন প্রেক্ষাগৃহে ওদের প্রথম অনুষ্ঠানের পরে ওদের সঙ্গে কথা বললাম। ওরা এখনও সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নয়। এখনই ওদের নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি কেন - এমন সংগত প্রশ্ন যাঁরা তুলবেন, তাঁদের জন্য আমি একটা অজুহাত তৈরি করে রেখেছি। একদম নতুন কোনও চেষ্টার খবর আমরা 'ই-মিউজিক'-এর মাধ্যমে মাঝে মাঝে সবার কাছে পৌঁছে দিতে চাই। নাহলে সবাই জানবে কী করে? কালোত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষুদ্রতম সম্ভাবনাকে অঙ্কুরে বিনাশ না করে আনকোরা নতুন 'ই-মিউজিক' আনকোরা নতুন 'রোদ্দুর'-এর হাত ধরল না হয়, ক্ষতি কী? তাতে হয়ত দুজনেরই চলতে একটু সুবিধে হবে।

ওদের 'আপনি' আমি বলতে পারব না... আমার সঙ্গে ওদের সেই সম্পর্ক নয়। 'তুমি'-টাই ঠিক আছে। 'মিউজিক'-এর তরফ থেকে ওদের জন্য শুভেচ্ছা রইল। আর রইল পঞ্চ-প্রশ্নবাণ।

মিউজিক - তোমরা তো সবাই একই মানের গায়ক-গায়িকা নও, তাহলে একসঙ্গে গাইবে ঠিক করলে কী ভেবে?

রোদ্দুর - আমাদের বন্ধুত্ব, সমমনস্কতা আর আমাদের মধ্যে musical connect থেকে একটা teamwork তৈরি হয়েছে। সেটাই বড়। আমরা কে কত ভাল বা খারাপ গাই সেটা বড় নয়। আমরা কেউ কোনও প্রস্তাব দিলাম, বাকি তিনজনের মধ্যে দু'জন সেটা মানল না আর একজন মানল, এমন খুব একটা হয় না। আমরা স্বভাবতই বেশ একমত। এছাড়াও আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব strength আছে। একসঙ্গে গাইলে সেগুলো আমরা পরস্পরের দুর্বলতাকে ঢেকে দেওয়ার কাজে লাগাতে পারি। ধরো, আমরা সেইভাবেই ভাগ করি যে কে গানের কোন অংশটা গাইবে। lyrics বা range অনুযায়ী একটা গানকে যদি এইভাবে ভেঙে নেওয়া যায়, তাহলে সেটা আমাদের একটা advantage দেয়, যেটা একা গাইলে পেতাম না। সেইসব কারণেই একসঙ্গে গাই।

মিউজিক - তোমরা যা দেখছ, তাতে তমাদের কোনও প্রতিযোগী নজরে পড়ছে?

রোদ্দুর - আমরা আমাদের অনুষ্ঠানের আগে কিছু sponsor এর খোঁজে বেরিয়েছিলাম। তখন সবাই আমাদের প্রথমেই বলেছে 'ব্যান্ড'। এখন আমরা যা বুঝি, তাতে ব্যান্ড মানে সেখানে vocalist ছাড়াও অন্য musician -রা সমান গুরুত্ব আর মর্যাদা পাবেন। বিগত কয়েক বছরে যেসব বাংলা ব্যান্ড আমরা দেখলাম, তাতে কিন্তু এটা তেমনভাবে হয়নি। বড়জোর দু'-একটা ক্ষেত্রে হয়ত এটা হতে পেরেছে। তাই আমরা এই নিজেদের 'দল' বলব না 'ব্যান্ড' বলব, এই ঝামেলার মধ্যে নেই। আর ঠিক আমাদের মতো দল কিন্তু নেই। আমরা চারজন vocalist বলে vocals-এর ক্ষেত্রে আমাদের options বেশী, ideas বেশী। সেগুলোকে নিয়ে এগোতে গিয়ে নিজেরাই শিখছি অনেক বেশী। এটা খুব enjoy করছি। competition এর কথা ভাবা হয়নি।

মিউজিক - Social network-এ তোমরা প্রথম অনুষ্ঠানের আগে থেকেই যে গুরুত্ব পেলে, এটাকে তোমরা কতটা তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছ?

রোদ্দুর - আমরা লোকের কাছে পৌঁছতে পারলাম, লোকে আমাদের কথা জানতে পারল। তাছাড়া যে ব্যাপারটাকে আমরা খুব কিছু গুরুত্ব দিচ্ছি তা নয়। Social media এখন বিনামূল্যে প্রচার করবার শ্রেষ্ঠ জায়গা। সেখানে কিছু লোক ওপর ওপর সবকিছুই দেখতে পায়, তারপর ভুলে যায়, তলিয়ে দেখে না, ভাবে না। Social media আমাদের যেটুকু visibility দিয়েছে সেটা কিন্তু আমরা এককভাবে অনুষ্ঠান করতে গিয়েও টের পেয়েছি। লোকে জিগেস করেছেন রোদ্দুর-এর ব্যাপারে। তাঁরা অনেকেই কিন্তু অনুষ্ঠানে আসেনি। তবে আগ্রহটা প্রকাশ করেছেন।

মিউজিক - বাংলা গানের হাল কেমন বুঝছ?

রোদ্দুর - এই মুহূর্তে খুব খারাপ। নতুন বাংলা গানকে জনপ্রি য় করবার কোনও মাধ্যম নেই। ফিল্মের গান দেখানোর, শোনানোর চ্যানেল, এফ এম স্টেশন অনেক আছে। তাই তার অগ্রগতিও অনেক দেখছি। বেসিক গানের কিন্তু এসব নেই। ফিল্মের, আর সেই সূত্রে ফিল্মের গানের প্রোডিউসার আছেন। তাঁর ব্যবসায়িক আগ্রহ থেকে তিনি গানকে ব্যবহার করেন। কিন্তু বেসিক গানে তো এখন বেশীরভাগ শিল্পীরাই প্রোডিউসার। আরেকটা ব্যাপার আছে। নতুন গান বেরোলে আমরা এখনও কলকাতায় দু'-চারটে hoarding দেখতে পাচ্ছি। বীরভূমে বা শিলিগুড়িতে সেগুলো ক'টা দেখা যাচ্ছে?

এরপর আসছে বাংলা গানের শ্রোতা। তাঁরা বড্ড পুরনো গান শুনতেই পছন্দ করছেন। নতুনের খবর নিতে তেমন আগ্রহী নন। প্রচারের অভাবে হয়ত অতি পরিচিত গোটা দশেক গান দিয়েই তাঁদেরও বিচার করে নিতে হচ্ছে যে নতুন বাংলা গান কেমন। রিমেক অ্যালবামে ভাটা পড়ার পিছনে যেমন কিছু সরকারি পদক্ষেপ আছে বলে শুনেছি, তেমনই নতুন বাংলা গানের প্রচারে সরকারের ভূমিকা থাকলে ভাল মনে হয়। সদর্থক হলে, বেসরকারি উদ্যোগও স্বাগত।

আরেকটা কথা মনে হয়... খুব ছোটদের কথা বলছি না... একটু বড় হয়ে যাওয়া ছোটরা... কিশোর-কিশোরীরা... তাদের জন্য কাজ হচ্ছে না। যে বয়সটা মনস্তত্ত্ব তৈরি করে, তার মনের জন্য উপযুক্ত খাদ্য নেই।

মিউজিক - 'রোদ্দুর'-এর চারজনেই তো compose করো বলে জানি। তাহলে তোমাদের প্রথম অনুষ্ঠানে তোমাদের কোনও composition পেলাম না কেন?

রোদ্দুর - ইচ্ছে ছিল। সময়ের অভাবে হল না। আমাদের গানগুলো নিয়ে যে ভাল করে সাজিয়ে গুছিয়ে উপস্থাপন করব... অথবা, একবার ভেবেছিলাম যে রোদ্দুর-এর একটা theme song হতে পারে কিনা... অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগেও ভেবেছি। এবারে সময় পাইনি। পরের বার নিশ্চয়ই হবে।

Photo feature: Bagbajar
Rise and fall of stars, the warmth of musical soirees, talents being treated with indifference and drastic changes in people's musical tastes - streets and lanes of Kolkata have seen it all. Top musicians have coveted praise from the Kolkata audience. Nooks and corners of the city are still holding tight to the memories of its musical past, whether or not we chose to ignore them.

In this photo-feature MUSIC highlights places of musical heritage in Kolkata. Here's what we have left of the sites that once witnessed the greatest of musical phenomena, hosted the greatest of musicians or were subjects of the greatest of musical creations.

We start with Bagbajar (Baghbazar, as the British preferred to spell it).

বাগবাজারের সিদ্ধেশ্বরী, অন্নপূর্ণার ঘাট,
ওই মা গঙ্গা যেথায় আমার বহেন দিনরাত,
একপাশে তার কুমোরপাড়া হচ্ছে ঠাকুর গড়া,
তার পাশেতে আছে যে গো মদনমোহনতলা -
এক কোণেতে বসে ভোলা গড়ছে কত ছড়া।
কৈলাসেরই সেই ভোলানাথ নই রে আমি নই। আমি ময়রা ভোলা, হরুর চ্যালা, বাগবাজারে রই।

The Siddheswari shrine and the Annapurna Ghat of Bagbajar,
Perennially washed by the flow of Mother Ganga,
The claysmiths shape their idols on this side,
Adjacent to the Madanmohun Temple,
Bhola sits in a corner and ponders on his rhymes.
This is not the Bhola of Kailasa that you know,
I'm the Bhola of Bagbajar, a confectioner and a discliple of Horu.

-Bhola Moyra

Durgadas Lahiri's famous encyclopaedic work on Bangla songs, lyricists-composers-singers titled 'Bangalir Gaan' refers to the fabled Kabiyal Bhola Moyra as a resident of Simulia and not of Bagbajar. Bhola had his confectionery in Bagbajar.

This is an exceptional song. It refers to some famous locations in the Bagbazar-Kumartuli locality of north Kolkata. It tells us who Bhola is, what he does and where exactly do we find him in this big metropolis. If you are new in the town, Bhola's song also provides information about the following landmarks that you can use to find your way to him.

1. Siddheswari Mandir

Gobindaram Mitra, the zamindar of Kumartuli, established the Nabaratna Mandir in Chitpur Road (the present Rabindra Sarani) in 1730. The pinnacle of Gobindaram's temple at 165 feet, it is said, was higher than the Ochterlony Monument. It was destroyed by the huge storm and earthquake on 10th or 11th October 1737, as per different sources. Some historians are of the opinion that Gobindaram's temple was a Kali temple. They also say that after the destruction of the old temple, Gobindaram's great grandson Abhaycharan Mitra constructed a new temple on the opposite side of Chitpur Road. The deity was shifted to the new temple and it was called the Siddhewsari Mandir. Those who support the other opinion that Gobindaram's old temple was a Shiva temple, say that the Siddheswari Temple was built by Banamali Sarkar.

2. Annapurna Ghat

Raghunath Mitra was the son of Gobindaram. Raghu Mitrer Ghat was named after him. Bishnuram Chakraborty, a resident of Bagbajar, was appointed as the ‘amin' during the lordship of Warren Hastings. Lord Hastings donated 52 bighas of land to Bishnuram when he left for England. Bishnuram established four Shiva temples near Raghu Mitrer Ghat in 1776. Subsequently Bishnuram constructed another temple and dedicated it to goddess Annapurna. Raghu Mitrer Ghat then gradually came to be known as Annapurna Ghat after the deity. The Annapurna temple is still there at 193 Bagbajar Street.

3. Madanmohan Temple

Raja Chaitanya Singha of Bishnupur was in deep financial distress and overburdened with debts. He used Madanmohan, his 'Kuladebata' (family God), as a mortgage while borrowing one lakh Rupees from Gokul Chandra Mitra of Bagbajar. The Madanmohan idol became Gokul Chandra's property as the loan was not repaid. Another opinion says that Gokul arranged to make a replica of the idol and asked Chitanya Singha to choose his idol from the two, when he came for the final repayment. It is said that Chaitanya Singha chose the wrong idol and took it back with him. Gokul built a temple for the original Madanmohan in 1761. This temple still remains an important landmark in the Bagbajar-Kumartuli area.

There is also a third opinion that the duplicate made by Gokul Chandra remained in the Bagbajar temple as Chaitanya took back the original to Bishnupur.

The Naatmandir (temple courtyard - picture above) of the Madanmohan temple is believed to be the largest Naatmandir in Kolkata. It was the venue of Swami Vivekananda's first felicitation ceremony arranged by Kiran Chandra Dutta and others, after he was back from the Chicago World Parliament of Religions.

All these landmarks are still there, but we have not cared enough to preserve Bhola Moyra's shop. Writers' Building and the 'boi-para' in and around College Street have been identified as heritage sites. Identifying a part of the city as a musical-heritage locality still seems a farfetched idea in this part of the world. We choose not to dwell too much on that and come back to the song instead.

Where else on earth would you find a song that serves as a business card and a road map?

Map source: GoogleEarth
Information Sources:
1. Bangalir Gaan - Durgadas Lahiri
2. Kolikata Darpan - Radharaman Mitra

Photos and feature by Snigdhadeb Sengupta

A special supplement added on the occassion of Baishe Srabon :
Songs of Tagore - Where Tradition Complements the Contemporary
Indrani Roy

Rabindranath Tagore, the name beyond just a name - a discipline as well as an institution - an epochal personality. His unparallel creations are most contemporary with their traditional values. Now, what is tradition? There are loads of scholarly discourses on this, but here I suppose to discuss about general pondering. Some people think that tradition is a kind of mummification of cognition lying in a sarcophagus of society and it is just a taboo to live in modernity. My question is: Is it possible to be contemporary without tradition? Like a metamorphic stream generating from a glacier and voyaging to the sea, traditions are carried by society through Mighty Time or Mahakaal with the endeavour of modernization. So, being contemporary is not about abolishing the tradition but cultivating its relative value for the prosperity of mankind and society.

We all know that Tagore was overwhelmed and obsessed with his unique creations in music. Tagore's prophecy regarding the eternity of his music was neither an exaggeration nor confidence. It was extreme passion, revelation, affection and love from a genius artiste. Such a genius Tagore was, that he collected all the components of music and united them such that they generate the 'tilottama' or the most perfect and beautiful magic of music.

Tagore's songs are the best examples of the marvellous fusion of tunes and lyrics. 'Fusion' is the most happening trend in world music. Lot of experiments are going on. Some create an aesthetic impact in the mind of a connoisseur and some can make ear-drums explode. Tagore's songs or Rabindrasangeet truly illustrate the ardhanarishwar concept, where tune and the lyrics complement each other. One of the traditional features of Bengali song is the perfect union of the lyrics and the tunes as Bengal has always been impregnated with gems in poetry, prosody and literature. Tagore was mesmerized by this characteristic of Bengali music and was inspired to create not a mimic but a star. The lyrics of Rabindrasangeet are not limited in time and space and are too rarefied and contemporary to justify the emotions of modern era. The will continue to justify human thoughts in the future also.

We can see that the modern Bengali dialects are being changed; lots of new words and phrases are being added to the Bengali vocabulary; some words are as perfect as gems for the casket of Bengali literature. However, some words are diminishing the values of Bengali culture. And these are being used in songs as well. We prefer to confer the crown of 'modern songs' upon them. Modernity is not in what we are living but what drives us towards the future - to the prosperity of mankind as well as the society in a broader sense.

It is painful and ridiculous when I see that some people treat Rabindrasangeet as 'non-modern' song. It has a strong base of traditional values. They think that traditional and modern are mutually exclusive in music. Every single word, note, emotion, imagery, metaphor of Rabindrasangeet bear a signature of modernity. They have huge justification and universal appeal in the modern world. Isn't it a contemporary characteristic? According to Tagore 'the language of music is universal' and his songs are testimony to his statement. Tagore's songs mesmerize the connoisseurs worldwide and make the drink the nectar of aesthetic beauty with serenity, purity and abstraction in concreteness.

Language is not an obstacle to cherish the emotions and sentiment of Rabindrasangeet because as a composer, lyricist, philosopher, poet, litterateur and aesthetician Tagore has done the needful. He has put in the efforts, care and love to make each and every song perfect in its unique way. What happens now is perturbing us and we have to reflect with all our refined sensitivity on this. In the name of fusion some people are distorting the soul of these songs by dishonouring the traditions. On the other hand the orthodox want to chain these songs with the frowning of restrictions. This duality engage people in vivisecting the songs and styles of presentation rather than cherishing their essence. In Tagore's words, "One extra petal cannot be put in a lotus; it blooms with its perfect totality that is why its beauty is infinite."1 (Translated)

Tagore's songs are end in itself. Therefore extra ornamentations become renundant because 'art is never an exhibition but a revelation'; 'the brag nature of exhibition lies in its superfluity and revelation lies in the fulfilment of its perfect harmonious whole'.2 Just as Tagore asserted-

"Where the clear stream of reason has not lost its way
Into the dreary desert sand of dead habit
Where the mind is led forward by thee
Into the ever-widening thought and action
Into that heaven of freedom, my Father, let my country awake."3

Tagore was a worshipper of freedom - freedom of thoughts, freedom of creation, freedom of mind. He never supported any kind of rigidity in the name of tradition. Therefore lots of experimentations have been done by him. He was inspired by the classic tunes. Also, he was deeply moved by the 'been' of snake-charmers. The orchestration of Rabindrasangeet is also a matter of contemporary relevance. Tagore had applied the classical instruments, folk instruments, regional instruments, Asian instruments, western instruments - everything that he considered appropriate for accompanying a particular song without compromising with its essence. So, instrumentation of Rabindrasangeet is not just accompaniment of Esraj, Tanpura and Tabla. It surely is more than that. Tagore was the classic fusionist, not only in his era, but also his creations and experimentations are too contemporary for the modern era, may be for the post modern times as well.

1Sur O Sangati, Sangeet Chinta, p-131
2Sur O Sangati, Sangeet Chinta, p-133
3It appeared as poem 35 in the English Gitanjali (Song Offerings) published by the Indian Society, London, in 1912